বাংলাদেশে গ্রামীণ নিরক্ষর মানুষেরা ব্যাংকিং সেবার সঙ্গে সম্পর্ক ও এই বিষয়ে তাদের ধারণা ও চ্যালেঞ্জ
গ্রামীণ নিরক্ষর মানুষের ব্যাংকের সঙ্গে সম্পর্ক

গ্রামের নিরক্ষর মানুষেরা ব্যাংকের সঙ্গে যে সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন, তার প্রধান কারণ হলো নিরাপত্তা। তারা জানেন যে, বাড়িতে টাকা রাখলে তা চুরি বা হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই কষ্টার্জিত সঞ্চয় নিরাপদ রাখতে তারা ব্যাংককে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য জায়গা মনে করেন। জমি, গবাদিপশু বা অন্যান্য সম্পদ বিক্রির পর যে বড় অঙ্কের টাকা আসে, তা তারা সরাসরি ব্যাংকে জমা রাখেন। এর পেছনের মূল উদ্দেশ্য হলো, যেকোনো জরুরি প্রয়োজনে বা ভবিষ্যতের জন্য সেই অর্থ নিরাপদে রাখা। তাদের কাছে ব্যাংক কেবল একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং একটি অর্থ সুরক্ষার আশ্রয়স্থল।
ব্যাংকিং সম্পর্কে তাদের ধারণা
ব্যাংকিং সেবা সম্পর্কে গ্রামীণ নিরক্ষর মানুষের ধারণা বেশ সীমিত। তাদের কাছে ব্যাংক মানে মূলত দুটি কাজ—টাকা জমা রাখা (সঞ্চয়) এবং প্রয়োজনমতো টাকা তোলা (উত্তোলন)। এর বাইরে ব্যাংকের অন্যান্য আধুনিক সেবা, যেমন:
- ঋণ সুবিধা (Loan): ব্যবসা বা কৃষিকাজের জন্য ব্যাংক থেকে যে ঋণ নেওয়া যায়, সে সম্পর্কে তাদের ধারণা নেই বললেই চলে।
- ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড: কার্ড ব্যবহার করে কেনাকাটা বা এটিএম থেকে টাকা তোলার পদ্ধতি সম্পর্কে তারা প্রায় কিছুই জানেন না।
- মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যাংকিং: স্মার্টফোন ব্যবহার করে ঘরে বসে লেনদেন করার সুবিধা সম্পর্কে তারা প্রায় সম্পূর্ণ অজ্ঞ।
- বীমা (Insurance) বা বিনিয়োগ: ব্যাংকের মাধ্যমে জীবন বীমা বা বিভিন্ন প্রকল্পে বিনিয়োগ করার সুযোগগুলোও তাদের জানার বাইরে।
এই সীমিত ধারণার কারণে, তাদের ব্যাংকিং সম্পর্ক কেবল সঞ্চয় এবং উত্তোলনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।
ব্যাংকিং আইন মেনে সেবা গ্রহণে চ্যালেঞ্জ
নিরক্ষরতার কারণে ব্যাংকের নিয়মকানুন মেনে চলতে গিয়ে গ্রামীণ মানুষ অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
- ফরম পূরণ: ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য বা অন্য কোনো সেবার জন্য যে ফরম পূরণ করতে হয়, তা তারা নিজেরা করতে পারেন না। এ কারণে তারা প্রায়শই ব্যাংকের কর্মচারীর বা পরিচিত কোনো শিক্ষিত ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল হন।
- স্বাক্ষর: অনেক সময় তারা স্বাক্ষর দিতে পারেন না, ফলে টিপসই (আঙুলের ছাপ) ব্যবহার করতে হয়। টিপসই দেওয়ার সময়ও তারা অনেক ক্ষেত্রে নিয়ম বা পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতন থাকেন না।
- আইনি প্রক্রিয়া বোঝা: ব্যাংকের চুক্তি, শর্তাবলি বা ঋণের কাগজপত্রগুলো সবই আইনি ভাষায় লেখা থাকে, যা তাদের পক্ষে বোঝা অসম্ভব। ফলে, প্রতারণার শিকার হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। অনেক অসাধু ব্যক্তি এই অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে তাদের সরলতার অপব্যবহার করে।
- প্রযুক্তিগত সমস্যা: এটিএম কার্ড, পিন নম্বর বা ডিজিটাল লেনদেনের নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়গুলো তাদের কাছে জটিল মনে হয়। ফলে, তারা প্রযুক্তিনির্ভর সেবা থেকে দূরে থাকেন।
উন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ
এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করার জন্য কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং আরও কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। বিভিন্ন ব্যাংক এবং এনজিও এখন গ্রামে আর্থিক সাক্ষরতা (Financial Literacy) কার্যক্রম চালাচ্ছে। তারা স্থানীয় ভাষায় এবং সহজভাবে ব্যাংকিংয়ের নিয়মকানুন বোঝাচ্ছেন।
সরকার এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত গ্রামীণ নিরক্ষর মানুষের জন্য এমন নীতিমালা তৈরি করা, যা তাদের ব্যাংকিং সেবা গ্রহণকে আরও সহজ ও নিরাপদ করে। যেমন—ভিডিওর মাধ্যমে বা স্থানীয় ভাষায় নির্দেশনা দেওয়া, সহজ ফরম্যাট ব্যবহার করা এবং ব্যাংকের কর্মীদের আরও সংবেদনশীল ও সহযোগী করে তোলা।
এসব উদ্যোগের মাধ্যমে গ্রামের নিরক্ষর মানুষেরা আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আওতায় আসতে পারবে, যা তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করবে এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নেও বড় ভূমিকা রাখবে।



Hi, this is a comment.
To get started with moderating, editing, and deleting comments, please visit the Comments screen in the dashboard.
Commenter avatars come from Gravatar.